৬০ দিনে দেশে ফিরেছে ৬ লাখ প্রবাসী, কোয়ারেন্টাইন সেবা নিয়েই প্রশ্ন !

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

‘বৈশ্বিক মহামারী’ করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনে দেশ। বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্যানার দিয়ে স্বাস্থ্য পরীক্ষা, আক্রান্তপূর্বক জনসচেতনতা, প্রতিরোধের ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
এ ছাড়া বেসরকারি, এমনকি প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বসে নেই পরিবারসহ ব্যক্তি বিশেষও। সরকারের নির্দেশ অমান্যে আইনের মাধ্যমে শাস্তি প্রদানের মতো কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার। কিন্তু তারপরও বিধি মানতে চাচ্ছে না বিদেশফেরত করোনা ভাইরাস সন্দেহভাজনরা। উল্টো ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছে তারা। দেশে আগতদের মাধ্যমে যেন এই ভাইরাস ছড়িয়ে না পড়তে পারে সেজন্য বিদেশফেরত ব্যক্তি এবং তার সংস্পর্শে যাওয়া লোকদেরও বিচ্ছিন্ন রাখা হচ্ছে। যেখানে রাখা হয়েছে তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘কোয়ারেন্টাইন’। কোয়ারেন্টাইন দুই ধরনের— একটি সরকারিভাবে অস্থায়ী কোয়ারেন্টাইন এবং অন্যটি ব্যক্তি বা পরিবারের ব্যবস্থাপনায় হোম কোয়ারেন্টাইন। ঢাকার আশকোনায় হজক্যাম্পে স্থাপন করা হয়েছে অস্থায়ী কোয়ারেন্টাইন, যার তদারক করছে সরকার।

কোয়ারেন্টাইনে ব্যবস্থাপনায় একসঙ্গে অনেক মানুষ রাখা হয়েছে, যারা একই টয়লেট ব্যবহার করছেন, একই সঙ্গে খাবার খাচ্ছেন— এ রকম অভিযোগ উঠেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে। এ ধরনের রোগ নিয়ন্ত্রণে এ ব্যবস্থা মোটেই উপযুক্ত নয়। কেননা কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ ছয়জনকে একসঙ্গে বা জীবাণুমুক্ত এক রুমে রাখা যায়, বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা বিভাগের (আইইডিসিআর) অভিযোগ— বিদেশফেরত ব্যক্তিরা কোয়ারেন্টাইনে থাকতে চাচ্ছে না। আবার কোয়ারেন্টাইন হোম থেকে পালানোর মতো ঘটনাও ঘটছে।
পাল্টা অভিযোগও রয়েছে। হজক্যাম্পে অস্থায়ী কোয়ারেন্টাইনে অব্যবস্থাপনার কারণে ইতালিফেরত প্রবাসীরা সেখানে থাকতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বিক্ষোভ করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেখানে সেনাবাহিনীর সদস্যসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে ইতালিফেরতদের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তায় শনিবার সন্ধ্যায় সেখানে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানা যায়, জেলা পর্যায়েও আইসোলেশন ওয়ার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসোলেশন কক্ষ রাখা হয়েছে। কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালে ২৫০ শয্যার আইসোলেশন কক্ষ স্থাপন করা হয়েছে। সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালও প্রাথমিক পর্যায়ের রোগীর জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

সরকারের তরফ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, গত ৭ মার্চ থেকে বিশ্বের ১১৮টি দেশের মধ্যে ৬৫টি দেশ থেকে বাংলাদেশে যারাই এসেছেন তাদের সবাইকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে।
বড় সমস্যা হচ্ছে, গত ২১ জানুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত ৬ লাখ ৬ হাজার ৫১২ জন যাত্রী বাংলাদেশে এসেছেন। এদের সবার হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকা বাধ্যতামূলক। এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে নজরদারি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে স্বাস্থ্য বিভাগের সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন— মানিকগঞ্জ, শরীয়তপুর, নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুর, ঝিনাইদহ, চট্টগ্রাম, নরসিংদী, গোপালগঞ্জ, ফেনী, বগুড়া, নাটোর, মাগুরা, যশোর, কুড়িগ্রাম, রাজবাড়ী, নীলফামারী, নোয়াখালী, কেরানীগঞ্জ, শেরপুর, ঝালকাঠি, পাবনা, জামালপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, খুলনা, সিলেট, চুয়াডাঙ্গা, নড়াইল, রাঙামাটি ও ভোলাসহ ৩৭ জেলার ১৩৪৫ জন।
জেলা সিভিল সার্জনসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা হোম কোয়ারেন্টাইনগুলো ‘আইসোলেশন ইউনিট’ নামে ওয়ার্ড করে তাতে তদারক করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ভাইরোলজি বিভাগের এক অধ্যাপক বলছেন, এটা মানসম্পন্ন কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থা নয়। যদিও সরকারের আইইডিসিআর নিশ্চিত করছে বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ৩ জন আক্রান্ত আছে।
তার মতে, এ ব্যবস্থাপনায় একসঙ্গে অনেক মানুষ রাখা হয়েছে। যারা একই টয়লেট ব্যবহার করছেন, একই সঙ্গে খাবার খাচ্ছেন। এ ধরনের রোগ নিয়ন্ত্রণে এ ব্যবস্থা মোটেই উপযুক্ত নয়। কেননা কোয়ারেন্টাইন ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ ছয়জনকে একসঙ্গে বা জীবাণুমুক্ত এক রুমে রাখা যায় বলে বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

এছাড়া এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলায় দেশের সব স্টেকহোল্ডারকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ না করায় ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।

Related posts

Leave a Comment