মানবিক কাজ করতে গিয়ে শিক্ষা জীবন শেষ, ফলাফল শুণ্য

প্রকাশিত: ১২:১৯ অপরাহ্ণ, জুলাই ৪, ২০২০

জাহাঙ্গীর আলম:-

রোহিঙ্গা আমাদের জন্য শুধু সংকট তৈরী করেনি কিছু সম্ভাবনা ও তৈরী করেছে। সম্ভাবনাটাকে কাজে লাগাতে পারলে শতভাগ সফল হওয়া যাবে। তার জন্য দরকার সঠিক পরিকল্পনা এবং সমন্বয়।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে এনজিও গুলো কাজ করে যাচ্ছে। স্কুল কলেজ এর ভবন তৈরী হচ্ছে। টেকসই রাস্তাঘাট নির্মান হচ্ছে। হাসপাতালে স্থায়ী উপকরণ দেওয়া হচ্ছে এবং রোগীর বেডের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। মানুষের লাইভলিহুড বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পাশাপাশি কক্সবাজার জেলার স্থানীয় বেশ কিছু মানুষের কাজের কর্মসংস্থান তৈরী হয়েছে। বিভিন্ন মৌলিক বিষয়ের উপর স্থানীয় যুবক/যুবতীদের দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে রাজাপালং, কুতুপালং, পালংখালী, হ্নীলা সহ বেশ কিছু বাজারে শতবছর ধরে কিছু ক্ষুদ্রব্যবসায়ী ব্যবসা করত। বর্তমানে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অনেকটা বেকার জীবন যাপন করছে। তাদের ব্যবসা চলে গেছে রোহিঙ্গাদের হাতে। এনজিওসহ সরকারের উচিৎ এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুণ:রায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করে দেওয়া।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে বাজার রয়েছে এবং এইটার মনিটরিং ব্যবস্থা ও রয়েছে সরকারের পক্ষে। বেকার বসে না থেকে ব্যবসা করছে এইটা অনেকটা ভাল সুফল বয়ে আনছে। কিন্তু মূল রাস্তার পাশে যে বাজার রয়েছে সে বাজারের ব্যবসা স্থানীয়দের হাতে থাকাটা মঙ্গল জনক। কিন্তু বর্তমানে ৭০ ভাগ ব্যবসা চলে গেছে রোহিঙ্গাদের হাতে। তাতে আস্থার সংকট তৈরী হচ্ছে।
কক্সবাজারের বেশ কিছু ছেলে মেয়ে সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে বেশ সুনামের সাথে। রোহিঙ্গা আগমনের পর নিজেদের পড়াশোনা গুটিয়ে চলে এসেছে কক্সবাজারে চাকরির উদ্দেশ্যে এবং অনেকটা তারা সফল। প্রথমদিকে দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা ছাড়া চাকরি পেয়েছে। বেতন ছিল ৩০-৫০ হাজারের মধ্যে। নিজের জীবনের চলার ধরন পরিবর্তন করে ফেলেছে সহজে। কেউ অনার্স ২য় কিংবা ৩য় বর্ষে কিংবা সদ্য বিশ্ব বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল। পিতা-মাতা ও মহা খুশি। কিছুদিন যেতে না যেতে প্রকল্প শেষ। মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। নিজের জীবন যাত্রার মান পাহাড় সমান বড় হয়ে গেছে। এখন আর কিছুতে অংক মেলাতে পারছেনা। প্রকল্প শেষ তা ও মেনে নিতে পারছেনা। হতাশায় ভরপুর জীবন। চোখে মুখে অন্ধকার। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা কলেজে ইয়ার গ্যাফ হয়ে গেছে, পরীক্ষা দিতে পারেনি চাকরির ব্যস্ততার কারনে। আবার অনেকেই আর ফিরে যায়নি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। নিমিষে নিভে গেল শিক্ষা জীবন। নিজে নিজের পঙ্গুত্ব বরণ করে নিল।
পাশাপাশি উখিয়া-টেকনাফসহ কক্সবাজার জেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে ক্লাস করার জন্য কোন ছেলে-মেয়ে পাওয়া যেতনা এখন ও অনেকটা তাই। যে সময় ক্লাসে থাকার কথা সে সময় ক্যাম্পে নিজেকে টাকার পেছনে লেলিয়ে দিয়েছে। পরীক্ষার সময় মাথায় হাত। হতাশায় বিদায় নিয়েছে প্রিয় ছাত্র জীবন থেকে। আর শেষ করা হয়ে ওঠেনি গ্রাজুয়েশান। তৈরী হলো শিক্ষার শূণ্যতা। নষ্ট হলো সম্ভাবনা। উখিয়া-টেকনাফ পিছিয়ে গেল কয়েক যুগ শিক্ষা দীক্ষায়।
আর এক ধরনের মেধাবী যুবক/যুবতী যাদের শিক্ষা জীবনের ফলাফল ভাল তারা মোটা অংকের চাকরি প্রাপ্তির ফলে নিজেকে আর যাচাই করেনি। সরকারী চাকরির মেয়াদ শেষ কিংবা নিজেকে আরো বিকশিত করার সুযোগ ছিল সে সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। আর এখন হা হুতাশ। প্রকল্প শেষ কিংবা বেতনের পরিমান অর্ধেক হয়ে গেছে যার ফলে হতাশায় কাঁটছে তাদের জীবন। সিদ্ধান্ত হীনতায় পার করছে দিন। ভবিষ্যত অনিশ্চতায় ভোগছে। এই অশান্তি ভর করছে পরিবারে এবং সমাজের উপর।
আর এক শ্রেণীর উন্নয়ন কর্মী চোখে পড়ে যারা কাজ করে স্থানীয় কিংবা জাতীয় এনজিওতে বিভিন্ন দাতা সংস্থার প্রকল্পে কিন্তু নিজেকে পরিচয় দেয় জাতিসংঘের অধীনে কাজ করে কিংবা দাতা সংস্থায় কাজ করে বলে নিজেকে জাহির করে এবং নিজের ফেইসবুক আইডিতে হরেক রকমের পরিচয় তোলে ধরে যা অত্যন্ত দু:খজনক। নিজ সংস্থার পরিচয় দেওয়া গর্বের এবং অহংকারের। এতে ছোট হওয়ার কিছু নেই। আপনার সংস্থা যতই ছোট হোক সেইটা আপনার অহংকার।
আর এক শ্রেণীর উন্নয়ন কর্মী চোখে পড়ে যারা সত্যিকার অর্থে মেধাবী এবং ভাল কাজ করে তাতে কোন সন্দেহ নেই। নিজ যোগ্যতায় আইএনজিও কিংবা ইউএন এনজিওতে। এইটা আপনার অর্জন তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু দেখা যায় এত অহংকার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মুশকিল। সে নিজেকে মনে করছে জাতিসংঘ হতে এসেছে। সে দুনিয়া হতে আলাদা এবং তার চাইতে মেধাবী আর কেউ নেই। এইটা একজন উন্নয়ন কর্মীর আচরন হতে পারেনা। উন্নয়ন কর্মীর আচরণ মানবিক আচরণ হবে। আপনার আচরণ দেখে অন্যজন শিখবে। কিন্তু এই অহমবোধ আপনাকে শেষ করে দিচ্ছে।
আমি কতবড় সংস্থায় কাজ করছি সেইটা বড় কথা নয় আমি যে সংস্থায় কাজ করছি সে সংস্থার মূল্যবোধ কতবড় সেইটা মুখ্য বিষয়। যার নেতৃত্বে কাজ করছি তার মূল্যবোধ এবং চিন্তা ভাবনা কেমন সেইটা মুখ্য বিষয়।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় ১৫,০০০ হাজারের অধিক স্থানীয় ছেলে মেয়ে বিভিন্ন এনজিওতে কর্মরত আছে বিভিন্ন পর্যায়ে। কেউ সাময়িক সময়ের জন্য কাজ করছেন আর কেউ আর একটি ভাল চাকরি পাওয়ার আগ পর্যন্ত কাজ করছেন। ভাসমান না থেকে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমি উন্নয়ন কর্মী হিসেবে নিজেকে তৈরী করব কী না? অর্ধেক উন্নয়ন কর্মী আর অর্ধেক ভাসমসান হলে কখন ও ভাল কর্মী তৈরী হবেনা। সিদ্ধান্ত নিতে হবে চূড়ান্তভাবে তাতে লাভবান হবে নিজে এবং নিজ সংস্থা।
ঘনঘন চাকরি বদলানোর চাইতে জরুরি হলো ভালো একটি সংস্থা বাছাই করে দীর্ঘদিন কাজ করা এবং নিবেদিত হয়ে সংস্থার সাথে কাজ করা। ধৈর্য্য ধারন করে কাজ করলে ভাল ফল পাওয়া যায়।
উন্নয়ন কর্মী হলো সে যে সাধারন মানুষের জন্য কাজ করেন এবং নিজেকে সাধারন ভাবেন, মানবিক কাজের সাথে নিজেকে যুক্ত রাখেন। ধৈর্য্যরে শেষ সীমানা পর্যন্ত অপেক্ষা করেন। ব্যাক্তি স্বার্থের উপরে ওঠে দলীয় স্বার্থের কথা ভাবেন। আমি নয় আমরা এই কথায় বিশ্বাস করেন। উন্নয়নে বিশ্বাস করেন। সর্বোপরী লড়াই করার মানসিকতা যাদের আছে তারাই উন্নয়ন কর্মী হিসেবে ভাল করে থাকেন।
দক্ষ উন্নয়ন কর্মী তৈরী হউক, মানবিকতা মনে প্রাণে লালন হউক তাতে কেবল উন্নয়ন সম্ভব।

লেখক:-

সহকারী পরিচালক-কোস্ট ট্রাস্ট।