বিত্তের কষাঘাত - মোঃ সফিকুল ইসলাম শরীফ

বিত্তের কষাঘাত – মোঃ সফিকুল ইসলাম শরীফ

প্রকাশিত: ১০:৪২ অপরাহ্ণ, জুন ৯, ২০২০

যে লোকটি দশ মিনিটের পথ যেতে দুটো টাকা ভাড়া কমাতে ৩০ মিনিট অপেক্ষা করে। যিনি পথে হাটতে হাটতে একটু পর পর পেছনে হাত দিয়ে দেখে নেয়, মানিবেগটা আছেতো! বাজারে গিয়ে খুজে বড় মাছগুলো আর ফিরে আসে সামান্য গুরো মাছ নিয়ে। বাকি ব্যাগ পুরোটাই শাকে ভড়া। আবার পাড়ার লোকের কাছে যার সম্মানের ঘাটতি নাই।

শত কষ্টের জীবনে যাদের কষ্ট বুঝার মতো সময় কারো থাকেনা। সেই লোকটিই কিন্তু এদেশের মধ্যবিত্ত পরিবার গুলোর অভিবাবক। তেমনি একজন আমার বাবা। শত কষ্টের মাঝেও মুখে গৌরবের হাসি, ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। অবশ্য মায়ের কথাতো আর ব্যাখ্যা করার দরকার মনে করিনা। মধ্যবিত্ত সমাজের মা গুলো না ধৈর্যের মূর্ত প্রতিক। কোনো সুখ বিসর্জন দেয়া নারীর প্রতিযোগিতা যদি আয়োজন করা হয়, আমার কেন যেন মনে হয় অনুষ্ঠানের মূল কথাটাই হবে, “শুধু মাত্র মধ্যবিত্ত মায়েদের জন্য।” অল্পে তুষ্ট থাকা, আবার সেই অল্পের ভাগ দিয়ে অন্যকে তুষ্ট করা নারীটিই হলো মধ্যবিত্ত মা। যখনই বাড়ি থেকে ভার্সিটিতে আসি, কখনো ৩০০ কখনো ৫০০ টাকা আমার হাতে বাবার আড়ালে তুলে দেয় মা। জিজ্ঞেস করলে বলে ডিম, মুরগির বাচ্চা বেচে জমিয়েছে। জানি আমি আসার পর তাদের দৈনন্দিন বাজার খরচ চলতেও হিমসিম খাবে। তবুও বাবার বুক ফুলানো কথা, ” বাবা কলিজা বেচে দিব, যদি তুমি কলিজা আমার মান রাখ।

সেই স্বপ্ন পুরণের প্রত্যাশায় অভিরাম শুধু এটাই খুঁজতাম কিভাবে বাবার পাশে দাড়িয়ে বলা যায়, বাবা আমি আছি। শহরের জীবনে মেধার বিচারে আমি জিতে গেলাম। বিভিন্ন বড় ভাইদের সহযোগিতায় কয়েকটা টিউশনির ব্যবস্থা হলো। সব মিলিয়ে হাজার ১২ পরে। এতেই আমার অনেক পাওয়া। বাড়ি গিয়ে রাতের খাবারের পর ৫০০০ হাজার টাকা বাবার হাতে তুলে দিতেই বাবা অবাক! মা তো তাকিয়েই আছে। সব খুলে বলাতে বাবার চোখের পানি গুলো হাসতে হাসতে ঝরতে লাগলো। মা খোদার কাছে আমার মঙ্গল চাইলো। ছোট ভাইটাকেও কিছু টাকা দিলাম। এইতো আমার সংসার হয়ে গেল মধ্যবিত্ত সুখী পরিবার। এভাবেই চলতে লাগলো।

কিন্তু সেই সুখে যে কোরনা নামের কোনো দস্যুর হানা পরে সব নিশ্চুপ করে দিবে ভাবতেও পারিন। কোরোনা, কোরোনা, আর কোরোনা। পুরো পৃথিবী দখল করে নিয়েছে করোনা ভাইরাস। নির্দেশ একটাই ঘরে থাকুন, নিরাপদে থাকুন। সেই সুবাদে ধনীরা ভান্ডার ভেঙে খাচ্ছে। দরিদ্ররা অনুদান পাচ্ছে। আর মধ্যবিত্তরা এখনো চোখের আড়ালেই রয়ে গেল। শুধু থমকে গেছে, ভেঙে গেছে আমার মতো মধ্যবিত্ত ছেলেগুলোর জীবন চলার গতি। বাবা এখনো ফোন দিয়ে বলে, ” খোকা কেমন আছিস? আমরা বেশ আছি। তুই কোনো চিন্তা করবি না। ” কি করবো তখন বুক চাপরে কান্না ছাড়া? আমিও তখন বলি, “বাবা আমিতো বের হতে না পারায় কিছু করতে পারছি না। কবে তোমাদের টাকা পাঠাতাম।”

কিন্তু কি করে বলি, যে, আমার প্রাইভেট বাসা গুলো প্রাইভেট বন্ধ করে দিয়ে সাফ বলে দিল স্যার পরিস্থিতি স্বভাবিক হলে পড়াবেন। কিন্তু কেও বলেনি, স্যার এতোদিন কি করে চলবেন? বলেনি তার কারণও আছে, ঐযে মধ্য বিত্তদের ভালো আছি কথাটার কারণে কেউ মধ্য বিত্তদের নিয়ে ভাবতেই চায়না। আত্বলজ্জায় নিজের চাহিদাটাও মেটাতে পারে না মধ্যবিত্তরা। উচ্চবিত্ত ও নিম্নবিত্ত এই দুই বিত্তর জাতাকলে মধ্যবিত্ত কখন যে থেতলে গেছে! অবশ্য সমাজের কিবা দোষ বলুন, সমাজ তো বুঝতেই পারেনি। অথচ ভাবুনতো কারা বেশি বিপদ গ্রস্থ? কাদের আজ সহযোগিতাটা বেশি প্রয়োজন? মুখ থুবরে পেটে পাথর বেধে যারা সম্মাণ বোধের তারনায় হাত পেতে চাইতে পারছে না, এই অবস্থায় তাদের পাশেইতো দাঁড়ানোর কথা! কি করে চলবে বলুন হাত পাতার স্বভাব যে মধ্যবিত্তরা গড়তে পারেনি।

তাই বলছি, সাহায্য নয়, চাই সহযোগিতা। তাহলেই থেতলে যাওয়া মধ্যবিত্তরা বেচেঁ যাবে। পৃথিবী তার নিয়মেই চলবে। এর বিরুদ্ধে আচরণ করে পাল্টে ফেলার মতো কোনো কিছুর অধিকার পৃথিবী মানুষকে দেয়নি। আপন নিয়মেই সব সুদ্রোবে। এই ক্রান্তি লগ্নে ঘরে থাকা যেমন জরুরি ঠিক তেমনি জরুরী মানুষ মানুষের পাশে থাকা। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবার গুলো যাদের আমার মতো ভার্সিটি পরুয়া সন্তান থাকা সত্বেও সন্তান আজ নিরুপায় হয়ে আছি। বাবা – মা গুলো তৃষ্ণার্তের কাক হয়ে তাকিয়ে আছে নিরব কোনো সাহারার আশায়। আজ পৃথিবী দখল দেয়া ভাইরাস মহামারি করোনায় পুরো পৃথিবী আজ যখন নির্বাক। তখন এই বাকরুদ্ধ পরিবেশ শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় পরিণত হয়েছে আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের। সন্তান হয়ে পরিবার পরিজনদের জন্য কিছু করাতো দূরের কথা দেখাটাও করতে পারছিনা। আমাকে নিয়ে দেখা বাবা মায়ের স্বপ্ন আজ বদ্ব ঘরে দুকরে কেদে মরছে।