নিজের শিশু এবং গাছের চারার মত পরিচর্যা করে বড় করতে হয় কর্মীকে

প্রকাশিত: ৮:৩৬ অপরাহ্ণ, জুলাই ৮, ২০২০

জাহাঙ্গীর আলম:-

বাংলাদেশে বহু দেশী-বিদেশী এবং স্থানীয় এনজিও কাজ করছে অবহেলিত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে। প্রত্যন্ত এলাকা গুলোতে কাজ করে যাচ্ছে এনজিও গুলো। লক্ষ লক্ষ কর্মী কাজ করছে সাধারন মানুষের সাথে একাকার হয়ে মিশে গিয়ে। অন্য পেশার চাইতে উন্নয়ন কর্মীর পেশাটি একদম আলাদা। দিন নাই, রাত নেই কাজ করেই চলছে। সমাজের একদম পিছিয়ে পড়া,অবহেলিত এবং বঞ্চিত মানুষের সাথে কাজ, পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের সাথে সমন্বয় এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সাথে মিলেমিশে কাজ করতে হয়। প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে কাজ করতে হয় উন্নয়ন কর্মীদের। দিন যত যাচ্ছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরী হচ্ছে এই পেশায়।
একটা সময় ছিল বাংলাদেশে কেউ চাকরি না ফেলে এনজিওতে এসে চাকির শুরু করত। কিন্ত বিগত বেশ কিছু বছর ধরে এই রেওয়াজ পরিবর্তন হয়ে গেছে। বর্তমানে এই পেশায় আসছে মেধাবী লোকজন এবং বিশ্ব বিদ্যালয়ের মেধাবী ছেলে-মেয়েরা। নতুন প্রজন্ম নিজেকে যোগ্য উন্নয়ন কর্মী হিসেবে তৈরী করার লক্ষ্যে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
একজন উন্নয়ন কর্মীকে বাইসেকল/মটর সাইকেল/ল্যাপটপ/বাংলা/ইংরেজী লেখা এবং বলায় পারদর্শীতা অর্জন করতে হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ের উপর প্রশিক্ষণ পরিচালনার উপর অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়। উপকারভোগী হতে কাজ আদায় করার কৌশল রপ্ত করতে হয়, প্রকল্পের কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট জনদের সাথে সম্পর্ক তৈরীর কৌশল রপ্ত করতে হয়। প্রতিবেদন তৈরীর দক্ষতা অর্জনসহ বহুমুখী প্রতিভার প্রয়োজন রয়েছে একজন দক্ষ উন্নয়ন কর্মী হিসেবে নিজেকে তৈরী করার ক্ষেত্রে। এই পেশায় প্রতিনিয়ত শেখার আছে। নিজের জানার জায়গা সমৃদ্ধ করার সুযোগ রয়েছে প্রতিনিয়ত। এই পেশায় দুইভাবে কাজ করা যায় হাঁটু দিয়ে এবং মাথা দিয়ে। যারা হাঁটু দিয়ে কাজ করে তাদের জানার এবং শেখার আগ্রহ খুবই কম। নিজেকে পরিবর্তন করতে ভয় পায়। কোন রকম মাঠে কাজ করে জীবন কাঁটিয়ে দিতে চাই। আবার যারা মাথা দিয়ে কাজ করে তারা নিজেকে পরিবর্তন করতে ভয় পায় না, প্রতিনিয়ত নিজেকে পরিবর্তন করার জন্য প্রাণপণ চেষ্ঠা করে। চ্যালেঞ্জ কিংবা কাজকে তারা ভয় করে না তারা এইটাকে উপভোগ করে।
এই সেক্টরে কর্মী তৈরী খুবই কঠিন একটি কাজ। বহু ধরনের বহু মানসিকতার মানুষের সংমিশ্রন। প্রশিক্ষণের পর প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ কর্মী তৈরী করতে হয়। নিজের শিশুকে যেভাবে বড় করতে হয় ঠিক তেমনিভাবে একজন কর্মীকে বড় করতে হয়। গাছের চারার মত পরিচর্যা করে বড় করতে হয়। নিজের সন্তান, ভাই এর মত স্নেহ,আদর দিয়ে তৈরী করতে হয়। তার রাগ,অভিমানকে মূল্যায়ন করতে হয়। একজন দক্ষ উন্নয়ন কর্মী তৈরী হতে বহু বছর সময় লাগে। এইটি একটি সাধনার বিষয়। ধৈর্য্য সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে কাজ করে। যারা ধৈর্য্যশীল তারাই এই পেশায় সফল হতে পারেন। অস্থির/অধৈর্য্য লোকজন মাঝ পথে গিয়ে থেমে যায় এবং ঝড়ে পড়ে।
কাজের পরিবেশ সবচাইতে বড় একটি বিষয়। এক এক সংস্থায় কাজের পরিবেশ এক এক রকম। কর্মী তৈরীর কৌশল ও ভিন্ন ভিন্ন। সংস্থার প্রধানের মূল্যবোধ,চিন্তা-চেতনার উপরে অনেক কিছু নির্ভর করে।
কোস্ট ট্রাস্ট কর্মী তৈরীর একটি কারখানা। প্রধান অফিস এবং মাঠের সিনিয়রদের মধ্যে ৯৫% কর্মীর চাকরির বয়স গড়ে ১৫ বছরের বেশী। নিজের জীবনের সোনালী সময় অতিবাহিত করেছেন এইখানে। সংস্থার প্রতি আন্তরিকতা এবং নিজের কাজের প্রতি নিবেদন শতভাগ। প্রতিটি অফিস শুধু অফিস নয় যেন এক একটি পরিবার। প্রতিটি কর্মী শুধু সহকর্মী নয় যেন পরিবারের সদস্য।
অভিজ্ঞতা ছাড়া চাকরি হয় বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে। প্রশিক্ষণের পর প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ কর্মী হিসেবে তৈরী করা হয়। প্রতিটি কর্মীর প্রতি আলাদা নজর দেওয়া হয়। দিনের শুরু থেকে ইংরেজী পত্রিকা পড়া এবং ইংরেজী শেখার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলা-ইংরেজী প্রতিবেদন তৈরীর উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সবচেয়ে বড় কথা যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রমোশন হয়। সংস্থার ৩০% এর ও বেশী কর্মী প্রতিনিয়ত বিদেশে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে যোগ দিচ্ছেন। সম্প্রতি মাঠ পর্যায় হতে ও বিদেশে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে যোগ দিচ্ছেন অনেক সহকর্মী। কোস্ট ট্রাস্ট শুধু নিজের জন্য কর্মী তৈরী করে না, সারা বাংলাদেশের জন্য কর্মী তৈরী করে চলছেন। সংস্থায় কাজ করেছেন এমন শত শত কর্মী বর্তমানে দেশ-বিদেশী বহু সংস্থায় দক্ষতার সাথে কাজ করে চলছেন। কর্মী সুস্থ থাকার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রতিদিন দিনের শুরুতে ব্যায়াম এবং বিকালবেলা হাঁটা অনেকটা বাধ্যতামূলক। যেকোন প্রশিক্ষণে সকালবেলা ব্যায়াম বাধ্যতামূলক।
সংস্থার নির্বাহী পরিচালক জ্ঞান নির্ভর নেতা তৈরীর উপর বিশ্বাসী। প্রতিটি কর্মীকে নিজের সন্তানের মত ভালোবাসেন, শাসন করেন, ভূল সংশোধন করে দেন এবং অনুপ্রেরণা দেন। কর্মীর মাথার উপর ছায়া হিসেবে থাকেন। কর্মীর দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নতুন নতুন কৌশল তৈরী করেন। সম্প্রতি সংস্থা ঘোষনা দিয়েছেন কাজ করতে গিয়ে কোন কর্মী করোনায় আক্রান্ত হলে তার পুরো ভার সংস্থা বহন করবে বলে এবং তাই হচ্ছে। সংস্থার কমীরা নির্ভয়ে এবং নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে কাজ করে চলছেন অত্যন্ত আনন্দের সাথে।
প্রতিটি উন্নয়ন কর্মীকে যে সংস্থায় কাজ করে সেখানে কমপক্ষে একটানা তিন বছর কাজ করা উচিৎ। তাহলে নিজেকে দক্ষ উন্নয়ন কর্মী হিসেবে তৈরী করতে সহায়ক হবে। অনেকে আছেন কিছু টাকা বেশী বেতন পেলে অন্যত্রে যোগদান করেন এবং সংস্থার সকল অবদানের ক্ষেত্রে নিমিষে ভূলে যান। ভূলে যান তাকে মটর সাইকেল চালানো/কম্পিউটার চালানো/ইংরেজী/বাংলা শেখানোসহ প্রশিক্ষণ কতই না তার পেছনে সংস্থা শ্রম দিয়ে গেছেন। মুহুর্তেই সবকিছু ভূলে চোখে চোখ রেখে মিথ্যা কথা বলে অন্যত্রে চলে যান। চলে যাওয়ার স্বাধীনতা সবার আছে তবে কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে হলে ভাল হয়। এই জগতটি খুবই ছোট সবার সাথে সবার দেখা হয়। যখন দেখা হয় তখন আবার মিথ্যা বলার জন্য মুখ লোকাতে হয়।
প্রতিটি কর্মীকে ইতিবাচকভাবে নিজ সংস্থার প্রতি অনুগত থাকা দরকার। আমি ইতিবাচক অনুগত থাকার কথা বলছি। পাশাপাশি নিজ সংস্থার প্রতি ভালবাসা থাকার কোন বিকল্প নেই। সবার আগে সংস্থা। সংস্থা বাঁচলে কর্মী বাঁচবে। আর দক্ষ কর্মী সংস্থার সম্পদ। কর্মীকে ভালবাসলে সে ভালবাসা ব্যর্থ হয়না ঠিক অন্যভাবে সে ভালবাসা ফিরে আসে। প্রত্যেক উন্নয়ন কর্মী সমাজের পিছিয়ে পড়া এবং বঞ্ছিত মানুষের উন্নয়নে নিবেদিত হয়ে এগিয়ে আসুক এবং দক্ষ উন্নয়ন কর্মী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করুক এইটায় কাম্য।

লেখক:
সহকারী পরিচালক-কোস্ট ট্রাস্ট।