করোনায় শিক্ষার্থীদের নিজেদের সচেতন হতে হবে

করোনায় শিক্ষার্থীদের নিজেদের সচেতন হতে হবে

প্রকাশিত: ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ, মে ২৩, ২০২০

“তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের দিক দিয়ে শহরের শিক্ষার্থীরা যতটুকু সচেতন, গ্রামাঞ্চল বা মফস্বলের শিক্ষার্থীরা ততোটা সচেতন নয়”

আমরা বর্তমান পরিস্থিতির ভিত্তিতে একজন শিক্ষকের সাথে অনলাইন ক্লাস নিয়ে এবং এর প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে কিছু কথা জানার চেষ্টা করবো। তিনি একাধারে একজন সফল শিক্ষক, সাংবাদিক, কলামিস্ট ও লেখক।

আমরা এখন কথা বলবো জনাব মোঃ সফিকুল ইসলাম স্যারের সাথে।

দেশের নিউজঃ  আসসালামু আলাইকুম স্যার, আমি deshernews24.com থেকে এসেছি। আপনার সাথে কিছু বিষয় নিয়ে আলাপচারিতা করার জন্যে। তা, ভালো আছেন আপনি?

সফিকুল ইসলামঃ আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি। আসলে কোভিড 19 নামের এই মহামারী ভালো থাকার প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মানসিকভাবে মাঝে মাঝে বিপর্যস্ত হয়ে যাই।

দেশের নিউজঃ তাতো অবশ্যই স্যার। আমরা আপনার সাথে এই সময়ের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কথা বলতে চাচ্ছি।

সফিকুল ইসলামঃ জ্বি, অবশ্যই।

দেশের নিউজঃ বর্তমান পরিস্থিতিতে অনলাইন ক্লাস শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে কতোটা প্রভাব ফেলছে?

সফিকুল ইসলামঃ বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার ক্ষতি যেন অনেকটা কাটিয়ে উঠতে পারে, সেজন্য সরকার অনলাইন ভিত্তিক ক্লাসের যে উদ্যোগ নিয়েছন, তা আসলেই প্রশংসনীয়। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারের দিক দিয়ে শহরের শিক্ষার্থীরা যতটুকু সচেতন, মফস্বল অথবা গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা ততোটা সচেতন নয়। কারন শহরের অভিভাবকরা শিক্ষিত ও সচেতন কিন্তু গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা বেশিরভাগই খেটে খাওয়া দিন মজুর, অশিক্ষিত ও অসচেতন। অনলাইনে ক্লাস করার জন্য মুটামুটি ভাল ধরনের একটি স্মার্ট ফোন দরকার। অনেকের তা কিনার সামর্থও নেই। আর যাদের আছে, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে যে, অভিভাবকদের সচেতনতার অভাবে শিক্ষার্থীরা ফেইসবুক নিয়েই ব্যস্ত থাকে বেশি। তাই অনলাইন ক্লাস শহরের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ভালো প্রভাব ফেললেও মফস্বল বা গ্রামাঞ্চলে তেমন একটা প্রভাব ফেলবে বলে আমার মনে হয়না।

দেশের নিউজঃ আপনার কি মনে হয় যে, লাইভ ক্লাস আর রেকর্ডেড ক্লাসে শিক্ষার্থীরা ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে উপকৃত হচ্ছে ? হলেও কিভাবে ?

সফিকুল ইসলামঃ আমি মনে করি, রেকর্ডেড ক্লাস থেকে লাইভ ক্লাস শিক্ষার্থীদের জন্য বেশি উপকারী ও উপযোগী। কারন রেকর্ডেড ক্লাস যখন শিক্ষার্থীরা দেখবে, তখন কোন জায়গায় বুঝতে সমস্যা হলে শিক্ষককে প্রশ্ন করে জানার কোন ব্যবস্থা নেই। কিন্তু লাইভ ক্লাসে শিক্ষার্থীরা কোন জায়গায় না বুঝলে সাথে সাথে শিক্ষককে প্রশ্ন করে বুঝে নেয়ার সুযোগ থাকে । তাই রেকর্ডেড ক্লাস থেকে লাইভ ক্লাসেই শিক্ষার্থীরা বেশি উপকৃত হবে।

দেশের নিউজঃ শিক্ষার্থীরা কি করে এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারবে?

সফিকুল ইসলামঃ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন যাবত বন্ধ থাকার কারনে শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, যা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠা সম্ভব নয়। বিদ্যালয়ে না গিয়ে শুধু ঘরে বসে পরিপূর্ণ শিক্ষা লাভ করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাপের মুখে লেখাপড়া করতে আগ্রহী হয়। এছাড়া সহপাঠীদের কাছ থেকেও সহযোগীতা পেয়ে থাকে। তাছাড়া এই পরিস্থিতিতে কাটিয়ে উঠতে পারলেও গ্রামাঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে অধিক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দেশের নিউজঃ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইনে ক্লাস নেয়া সম্পর্কে আপনার মতামত কি?

সফিকুল ইসলামঃ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অনেক সচেতন এবং তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ে অনেকটা এগিয়ে থাকলেও অনলাইন ক্লাসে পরিপূর্ণ শিক্ষা লাভ করা সম্ভব নয়, যা সরাসরি ক্লাসে অর্জন করা সম্ভব। সরাসরি ক্লাসে গ্রুপ ওয়ার্ক করে শিক্ষার্থীরা পরস্পরের সহযোগিতায় যে সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারবে তা অনলাইন ক্লাসে সম্ভব নয়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে অনলাইন ক্লাসগুলো শিক্ষার্থীদের অনেকটাই উপকারে আসবে বলে আমি মনে করি। তথাপিও বলা যায়, প্রকৃত শিক্ষা অর্জন করতে এটাই যথেষ্ট নয় কারণ তারা দেশের ভবিষ্যত। তাদের জন্য সরাসরি উপলব্ধ জ্ঞান অর্জন আবশ্যক ও গুরুত্বপূর্ণ।

দেশের নিউজঃ ব্রাহ্মনবাড়িয়ায় লকডাউনের মধ্যেও একটা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাইকিং করে পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য যা করলো,সে ব্যপারটা কিভাবে দেখছেন?

সফিকুল ইসলামঃ আজকের শিক্ষার্থীরাই আমাদের আগামীদিনের ভবিষ্যত । এই ভবিষ্যত প্রজন্ম সুরক্ষিত থাকলেই আগামীতে দেশ ও জাতি সুরক্ষিত থাকবে। এই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ঘোষণা করে সরকার একটি যুগপোযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শুধু বাংলাদেশেই নয় সারা বিশ্বের যে সকল দেশে করোনার প্রাদূর্ভাব দেখা দিয়েছে, সে দেশগুলোর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি খোলা থাকে আর যে কোন একজন শিক্ষার্থী যদি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে বিদ্যালয়ে আসে, তাহলে বিদ্যালয়টির সকল শিক্ষার্থী আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সেখানে প্রধান শিক্ষক মাইকিং করে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে বলাটা মোটেও ঠিক বলে আমার কাছে মনে হয়নি। একটি দায়িত্বশীল পদে থেকে এ ধরনের কাজ করাটা ঠিক হয়নি। আমি মনে করি তিনি এ ধরনের কাজ করে জনসাধারণের নিকট নিজেকে এবং শিক্ষক সমাজকে সমালোচিত করেছেন। তাছাড়া তিনি সরকারের বিধি নিষেধও অমান্য করেছেন।

দেশের নিউজঃ আপনি গণিত ও বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক। এই বিষয়সহ অন্যান্য বিষয়ের প্রতি কেমন গুরুত্ব বহন করে শিক্ষার্থীদের জন্য এই সময়ে ? এবং আপনার পরামর্শ কি?

সফিকুল ইসলামঃ সকল বিষয়েই শিক্ষার্থীরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করলে এই সময়টাকে ভালভাবে কাজে লাগাতে পারে। যাদের পরিবারে অথবা আশেপাশে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বড় ভাই-বোন আছে, তাদের কাছ থেকে অথবা পার্শ্ববর্তী সহপাঠিদের কাছ থেকে সহযোগিতা নিতে পারে। বর্তমানে তথ্য প্রযুক্তির দিক থেকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে।যাদের ইন্টারনেটের ব্যবস্থা আছে, তারা ইন্টারনেটের সাহায্য নিতে পারে। ইন্টারনেটে সকল শ্রেণির সকল বিষয়ের উপর অনেক ভালো ভালো শিক্ষকের ভালো ভালো ক্লাস রয়েছে। যাদের পরিবারে স্মার্টফোন রয়েছে, ইচ্ছে করলে ইউটিউব থেকে যেকোন বিষয়ের উপর তৈরীকৃত ক্লাস ডাউনলোড করে অথবা সরাসরি দেখে নিজের সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারে। তাছাড়া যে কোন বিষয়ে সমস্যা হলে বিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিষয়ের শিক্ষককে ফোন করে অথবা ভিডিও কলের মাধ্যমে সহযোগিতা নিতে পারে। তবে আমার একটাই কথা, ” না করলে চর্চা, হয়ে যায় খরচা “। আমি আহবান করবো, তোমরা পড়াশোনা অব্যাহত রাখবে।

দেশের নিউজঃ শিক্ষার্থীদের জন্য ও দেশের আপামর জনসাধারণের জন্য আপনার কাছ থেকে সচেতনতামূলক পরামর্শ আশা করছি।

সফিকুল ইসলামঃ দেশে করোনাভাইরাসের এই মহামারি অবস্থায় সকল অভিভাবকদের উচিত তাদের সন্তানদের দিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখা। অপ্রয়োজনে যেন কেউ বাড়ি বা বাসা থেকে বের না হয়। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র অভিভাবকরা এনে দেবেন। অতি প্রয়োজনে যদি বের হতে হয়, তাহলে সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। আর শিক্ষার্থীদেরকে বলছি, তোমরা অযথা ঘর থেকে বের হবেনা। সময়টাকে অপচয় না করে লেখা পড়ায় আরো বেশী মনযোগী হও।

দেশের নিউজঃ আপনি আমাদের মূল্যবান সময় দিয়েছেন, অনেক অনেক ধন্যবাদ। সফিকুল ইসলামঃ আপনাকেও ধন্যবাদ। আপনাদের পোর্টালের জন্য শুভকামনা রইলো।

সাক্ষাৎকার প্রদানকারীঃ মোঃ সফিকুল ইসলা, শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক ও কলামিস্ট।