করোনাকালে বিশেষ শিশুদের দিনলিপিঃ ডিসি কামাল হোসেন

প্রকাশিত: ১০:৫০ পূর্বাহ্ণ, জুন ১৯, ২০২০

দুই কামরার একটি ছোট্ট ঘরে অনেক দিন ধরে বন্দি আট বছরের শিশু উজাইমা। ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত সে। পড়ছে কক্সবাজার  শহরের সার্কিট হাউস সড়কে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের স্কুল ‘অরুণোদয়ে’। করোনাভাইরাসের কারণে স্কুলটি বন্ধ ১৮ মার্চ থেকে। ঘরের ছোট্ট কক্ষে অস্থির সময় কাটছে তার। মাঝেমধ্যে স্কুলে যাওয়ার বায়না ধরে সে, করে কান্নাকাটি। মায়ের কাছে জানতে চায় এটাসেটা। কিন্তু সব কিছুর উত্তর দিতে পারেন না মা। বাবাও পাশে নেই। চার বছর আগে ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে মারা যান উজাইমার বাবা নাট্যকর্মী বদরুল আলম লিটন। উজাইমা আর তার ছোট ভাই রায়নকে নিয়ে মায়ের কষ্টের সংসার। মায়ের বেশির ভাগ সময় চলে যায় মেয়েকে নিয়েই। করোনার এই মহামারিতে মেয়ের এ অস্থিরতা কবে কাটবে—জানেন না তিনি।

পৃথিবীজুড়ে বেড়েই চলছে মৃত্যুর মিছিল। যেন থামানো যাচ্ছে না কিছুতেই। করোনা সৃষ্ট বৈশ্বিক এ মহাদুর্যোগে আমরা অনেকে ঝুঁকিতে থাকলেও অধিকতর ঝুঁকিতে রয়েছে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা। করোনা সংক্রমণ থেকে রেহাই পেতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সারা দিন বেশি বেশি করে হাত ধোয়া, অপরিষ্কার হাত দিয়ে নাক-মুখ স্পর্শ না করা, হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলা এসব স্বাস্থ্যবার্তা জারি করেছে। আমরা যারা সুস্থ আছি, নিজেদের কাজ নিজেরা করতে পারি তারা না হয় এসব মেনে চলতে পারব; কিন্তু যারা নিজেরা নিজেদের কাজ করতে পারে না, অন্যের ওপর নির্ভরশীল কিংবা যাদের আদৌ বোঝার ক্ষমতাই নেই হাত ধোয়া কী হাত পরিষ্কার কী অপরিষ্কার।

এ মুহূর্তে স্বাভাবিক শিশুরা যেখানে অস্থির হয়ে উঠছে, সেখানে কেমন আছে এসব বিশেষ শিশুরা, কিভাবে মা-বাবারা সামলাচ্ছেন তাঁদের সন্তানদের, সে খোঁজ আমরা কতজন রেখেছি। এর বাইরেও বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধিতায় আক্রান্ত মানুষগুলোও রয়েছে আমাদের চেয়ে ভিন্নতর বিপদে। সরকারের নির্দেশনায় এরই মধ্যে দেশের সব জেলার সমাজসেবা অফিসে অসহায় প্রতিবন্ধীদের তালিকা করা আছে, খুব সহজেই প্রতিবন্ধী মানুষের কাছে এই মহাদুর্যোগে খাদ্য ও অর্থসহায়তা পৌঁছানো হয়েছে।

বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অভিভাবকরা বর্তমানে অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করছে। এ চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলায় তাদের বিশেষ শিশুদের জন্য কতিপয় পরামর্শ অনুসরণ করতে পারেন যেমন—১. পরিবারের সব সদস্য এখন ঘরে থাকেন, তাঁদের সান্নিধ্যে শিশুদের আচরণ অভিযোজন করুন। তাদের সঙ্গে মিলে আগের দৈনিক কর্মসূচিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনুন। দৃশ্যমান কোনো স্থানে তা লটকিয়ে রাখুন, যাতে তারা সহজেই দেখতে পারে। কোনো কোনো শিশু লিখিত, আবার কোনো শিশু ছবির মাধ্যমে তৈরি শিডিউল পছন্দ করে। ছবির ক্ষেত্রে নিজ পরিবারের ছবি হলে ভালো, না হলে গুগলের ছবি ব্যবহার করা যেতে পারে। শিডিউলটি জটিল এবং সময়াবদ্ধ না করাই ভালো। অর্থাৎ সময়সূচিটি শুধু আপনার সন্তানের মতো করেই তৈরি করুন। ২. কভিড-১৯-এর জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত সচেতনতামূলক স্বাস্থ্যবার্তা এবং করণীয় বোঝানোর জন্য আপনার পারিপার্শ্বিক অবস্থা হতে অথবা অনলাইন থেকে শব্দ কিংবা ছবি ব্যবহার করে নিজের মতো তাদের করণীয় অভ্যাস করানোর চেষ্টা করুন। বারবার হাত ধোয়া, গরম পানি পান করা, কমপক্ষে তিন ফুট দূরে অবস্থান করা, মাস্ক পরা প্রভৃতি বিষয় নিজেরা করে তাদের শেখানো যেতে পারে। তাদের উপযোগী করে করোনাভাইরাসের ক্ষতির বিষয়টি বোঝাতে হবে।

৩. কোনো একটি কাজ কখন শেষ করতে হবে, শিশুর সেবাদানকারী কতক্ষণ যত্ন নেবে বা কোন ইভেন্ট কখন শেষ হবে তার জন্য ভিজুয়াল বা অডিটরি টাইমার ব্যবহার করতে পারেন। যেমন—পাঁচ মিনিটের মধ্যে হাত ধোয়ার সময় হবে সুতরাং খেলার সময় আর মাত্র পাঁচ মিনিট আছে—এ রকম রিমাইন্ডার ব্যবহার করা যায়। ৪. শিশুদের পছন্দের কিছু কিছু স্থান ভার্চুয়ালজগতে ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে, তাই আপনার সন্তানের প্রিয় স্থান বা পছন্দের জিনিস মাঝেমধ্যে ভার্চুয়ালজগতে  দেখাতে  পারেন। ৫. ঘরের  মধ্যে সাইকেল চালানো, ফুটবল নিয়ে খেলা করা, পোষা প্রাণী থাকলে তার সঙ্গে খেলা করে নিজ ঘরেই বাইরের পরিবেশ তৈরি করুন। ঘরে থাকা বিভিন্ন  উপকরণকে শিশুদের উপযোগী করে খেলনা হিসেবে  ব্যবহার করতে পারেন। ছবি আঁকা কিংবা যে কাজটি শিশুরা সারা দিনে বেশি পছন্দ করে তাদের সে কাজটি বেশি সময় ধরে করতে দিন। মূলত মা-ই সন্তানকে বেশির ভাগই সময় দিতেন, এখন বাবাকেও দিনের উল্লেখযোগ্য সময় সন্তানকে দিতে হবে।

৬. সুযোগ থাকলে  পেছনের উঠানটিতে বা ছাদে  হৈ-হুল্লোড় কিংবা খেলা করুন। সকালের দিকে ঘরের বারান্দায় বা উঠানে কিংবা ছাদে একটু রোদ লাগানোর চেষ্টা করুন। সুস্থ থাকার জন্য টাটকা বাতাস আর রোদ খুবই  গুরুত্বপূর্ণ। ৭. আপনার সন্তানের পছন্দের বই বাসায় থাকলে কিংবা অনলাইন লাইব্রেরি থেকে নিয়ে পড়তে পারে সে ব্যবস্থা করে দিন। খেয়াল রাখতে হবে, শিশুরা যেন ঘরে থাকার এ সুযোগে মোবাইল ব্যবহারে আসক্ত না হয়ে পড়ে। ৮. বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের বিশেষ ডায়েট বা তাদের জন্য কিছু নির্ধারিত খাবার থাকতে পারে তা আগে থেকেই তৈরি করে রাখুন এবং সময়মতো তাদের তা খেতে দিন। তাদের সাধারণ খাবারের সঙ্গে প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেলযুক্ত খাবার বেশি বেশি করে খাওয়াতে হবে। সারা দিন ধরে গরম চা, আদা পানি, লেবুর সরবত, গরম স্যুপও খাওয়াতে ভুলবেন না। ৯. আপনার সন্তানের জন্য পূর্বনির্ধারিত পরিচিত ডাক্তার, স্কুলের শিক্ষক বা তার নিজ স্কুলের  সঙ্গে টেলিফোনে, অনলাইনে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ২৪ ঘণ্টা সংযুক্ত থাকুন, যাতে দূর হতেও আপনার সন্তানের চাহিদামাফিক সেবা সহজেই পেতে পারেন। শিশুরা বন্ধুদের সঙ্গে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে অবসরে আড্ডা, সেশন করতে পারে।

১০. অটিজম নিয়ে যাঁরা গবেষণা করেন তাঁদের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে নতুনভাবে উদ্ভাবিত বিভিন্ন প্রয়োজনীয় বিষয় জেনে নিয়ে প্রয়োজনে শিশুর জন্য কাজে লাগাতে পারেন। ১১. কিছু কিছু ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া এ সময়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য কভিড-১৯ সময়ে করণীয় বিষয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান এবং সচেতনতামূলক নিবন্ধ প্রকাশ করে থাকেন, যা অভিভাবকরা অনুসরণ করতে পারেন। ১২. মা-বাবা উভয়ই করোনায় আক্রান্ত হলে শিশুর যত্ন কিভাবে হবে তার পরিকল্পনা নিয়ে রাখুন। মা-বাবার বাইরে শিশু যাকে বেশি পছন্দ করে তাকেও প্রস্তুত করে রাখুন। শিশু আক্রান্ত হলে নিকটবর্তী কোন হাসপাতালে তার চিকিৎসা হবে তা খোঁজখবর নিয়ে আগে থেকেই ঠিক করে রাখতে হবে। জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন, জেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এবং উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, উপজেলা সমাজসেবা অফিসারের সঙ্গে আগে থেকেই সংযোগ স্থাপন করে রাখুন, যেকোনো চরম বিপদে তারা সহায়তা দিতে আইনগতভাবে প্রস্তুত রয়েছে।

এনডিডি ট্রাস্টও এ ক্ষেত্রে সহায়তা করে থাকেন। ১৩. মনে রাখবেন সন্তানের যত্ন নেওয়া যেমন আপনার কাছে জরুরি, ঠিক তেমনি আপনার নিজের যত্ন নেওয়া সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের যেসব সদস্যকে বাইরে যেতে হয় তাদের বাদ দিয়ে অন্যদের মধ্যে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের পরিচর্যার দায়িত্ব ভাগ করে দিন। দিনের কিছুটা সময় রিলাক্স থাকার জন্য আপনি ডিপ ব্রিথিং নিন, পছন্দের গান শুনুন, আড্ডা দিন প্রিয়জনের সঙ্গে। আপনার শিশু তার শিক্ষক বা থেরাপিস্টদের কাছ থেকে যে সেবা পেত, এখন তা নিজে নিজে দিতে উদ্বিগ্ন হবেন না। করোনা নিয়ে নিজেরা আতঙ্কগ্রস্ত হবেন না, আপনার কাছে যা আছে তা দিয়েই যথাসাধ্য চেষ্টা করুন। শিশুরা কম সময়ে স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করতে পারে এবং তারা ভালো থাকবে এটা মনে রাখবেন। আইনমতে হাসপাতালগুলো প্রাপ্যতার ভিত্তিতে চিকিৎসাসেবায় বিশেষ অগ্রাধিকার পাবে এসব শিশু। আমরা সবাই যেমন স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজে সুস্থ থাকব, তেমনি এ সময়ে অধিক ঝুঁকিতে থাকা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এসব শিশুর সহায়তায় পাশে থাকব। এ কঠিন সময়েও যেন তাদের ভুলে না যাই। নিশ্চয়ই সবাইকে নিয়েই ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ।

লেখক : জেলা প্রশাসক, কক্সবাজার