ই-কমার্সে লক্ষণীয় অগ্রগতি, করোনার মধ্যেও নতুন উদ্যোগ

প্রকাশিত: ১২:০৩ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ৩, ২০২০

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে অনেক খাত ক্ষতির মুখে পড়লেও নতুন কিছু খাতে ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষত মেডিকেল টেক্সটাইল, প্রযুক্তি ব্যবহার করে লেনদেন ও কার্যক্রম, জীবাণুনাশক পণ্য, ওষুধসহ কিছু পণ্যের ব্যবসা বেড়েছে। ই-কমার্সের মাধ্যমে নতুন নতুন ব্যবসার খবর পাওয়া যাচ্ছে। ফলে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, করোনাভাইরাস অবশ্যই অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা। এর ফলে পুরো বিশ্বের উৎপাদন ও সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যেও কিছু সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ নতুন কিছু বাজার পাচ্ছে। নতুন কিছু পণ্যের রপ্তানি অর্ডার আসছে। দেশের ভেতরে ই-কমার্সের বিস্তৃতি হয়েছে ব্যাপকভাবে। লেনদেনে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। অন্যদিকে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পরে বিশ্বের ধনী দেশগুলো চীননির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। এতে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে জাপানি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছেন। আবার মধ্যপ্রাচ্য, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে চাচ্ছে। এমনকি চীনও বাংলাদেশ থেকে আমদানি বাড়াতে চাচ্ছে।

করোনাভাইরাসের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকে কর্মী ছাঁটাই করেছে। অনেকেই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন উদ্যোগ নিয়ে এসেছেন। সরকারও ছোট, কুটিরশিল্প ও এসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের সহায়তা করতে এগিয়ে এসেছে। এ ছাড়া নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে মুজিববর্ষ উপলক্ষে কর্মসংস্থান ব্যাংকের মাধ্যমে ২০০ কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে। দেশের বাজারেও স্বাস্থ্য সুরক্ষা পোশাক, জীবাণুনাশক, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এসব পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। চায়ের দোকানগুলোতে কাগজের ও প্লাস্টিকের তৈরি ওয়ানটাইম কাপের ব্যবহার বেড়েছে। এ খাতেও অনেকে বিনিয়োগ ও ব্যবসা শুরু করেছেন।

গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাশরুর রিয়াজ বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে তিনটি খাতে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমত- কয়েকটি নতুন পণ্য ও নতুন বাজারে ঢুকেছে বাংলাদেশ। দ্বিতীয়ত- সরকার পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বেশ কিছু ক্ষেত্রে সংস্কার করেছে। অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে কাজের ধরনে পরিবর্তন আসছে। এতে বিভিন্ন দেশের আউটসোর্সিং চাহিদা বাড়বে। বাংলাদেশ এই নতুন সেবাবাজারে বড় অংশীদার হতে পারে। এজন্য আইটির অবকাঠামো ও দক্ষতা বাড়ানো দরকার।

মেডিকেল টেক্সটাইল :করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর বিশ্বব্যাপী হঠাৎ করে মেডিকেল টেক্সটাইল বিশেষ করে মাস্ক ও পিপিইর চাহিদা বেড়ে যায়। শুরুর দিকে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য বাংলাদেশও পার্সোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) আমদানি করেছে। এ অবস্থার মধ্যেই দেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো অতি দ্রুত পিপিই তৈরি করলে দেশে সরবরাহের পাশাপাশি রপ্তানিও বাড়তে থাকে। গত অর্থবছরে শেষ তিন মাসে আট কোটি ২৬ লাখ ডলার মূল্যের পিপিই রপ্তানি হয়েছে। এখন রপ্তানি আরও বেড়েছে। একই অবস্থা মাস্কের ক্ষেত্রেও। বাংলাদেশ নিটওয়্যার রপ্তানিকারকদের কাছে মার্চ থেকেই মাস্কের রপ্তানি অর্ডার বাড়তে থাকে। মার্চ-জুন সময়ে রপ্তানি বাড়ায় গত অর্থবছর মাস্ক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩১৯ শতাংশ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে মাস্ক রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৫৫ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যা গত অর্থবছরে বেড়ে হয়েছে দুই কোটি ৩১ লাখ ৮০ হাজার ডলার। বাংলাদেশ যেহেতু আগে থেকেই তৈরি পোশাকের বাজারে ভালো অবস্থানে ছিল, সে জন্য নতুন এই বাজারটি সহজে ধরতে পেরেছে। দেশের অনেক উদ্যোক্তা এ খাতে নতুন বিনিয়োগ করেছেন। স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করতে অনেকে নেমেছেন এ ব্যবসায়। ইউরোপ, আমেরিকা ছাড়াও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে পিপিইর অর্ডার আসছে।

ওষুধ ও স্যানিটাইজার :আবার জীবাণুনাশক বিশেষ করে হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বাজারেও বাংলাদেশ বেশ এগিয়েছে। এর আগে বাংলাদেশের যেসব কোম্পানি হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করত তারা উৎপাদন ক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারত না। মাত্র ১০ থেকে ১৫ ভাগ ব্যবহার করত। করোনাভাইরাসের পর এসব কোম্পানি সক্ষমতার পুরোটাই ব্যবহার করছে। করোনার প্রতিষেধক রেমডিসিভির রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। বাংলাদেশের তিনটি কোম্পানি মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এই ওষুধ রপ্তানি করছে। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, হ্যান্ড স্যানিটাইজার রপ্তানিতে আগের অর্থবছরের তুলনায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০৭ শতাংশ। বিভিন্ন ধরনের সার্জিক্যাল, মেডিকেল ও ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী রপ্তানির বিপুল সম্ভাবনা কাজে লাগাতে একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ইপিবি। এতে পিপিইর জন্য স্বতন্ত্র এইচএস কোড প্রণয়ন, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ল্যাবরেটরি স্থাপন, টেকনোলজি আপগ্রেডেশন ফান্ড গঠন ও নগদ সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। নীতিনির্ধারকরা বলছেন, সঠিক উদ্যোগ ও পরিকল্পনা নেওয়া হলে মাস্ক, স্যানিটাইজার, পিপিই, ফ্লোর ক্লিনার ছাড়াও সুরক্ষা চশমা, আই-শিল্ড, মরদেহের ব্যাগ, সার্জিক্যাল ক্যাপ রপ্তানিতেও বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের সামনে।

ই-কমার্স :বিশেষ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ই-কমার্সের ব্যাপ্তি বেড়েছে। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) জানিয়েছে, গত মার্চ থেকে ই-কমার্সের মাধ্যমে নিত্যপণ্য সরবরাহের সুযোগ হয়। এ পর্যন্ত কমপক্ষে তিন হাজার কোটি টাকার নিত্যপণ্য সরবরাহ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে গত ছয় মাসে ১৬ হাজার কোটি টাকার পণ্য সরবরাহ করেছে ই-ক্যাবের সদস্যরা। এর বাইরেও অনেকে ই-কমার্সের মাধ্যমে ব্যবসা করছে। কোরবানির সময়ে অনলাইন পশুর হাট বেশ সাড়া পেয়েছে। বর্তমানে ই-কমার্সের মাধ্যমে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে।

এটুআই প্রকল্পের রুরাল ই-কমার্স বিভাগের টিম লিডার ও হেড অব কমার্শিয়ালাইজেশন রেজওয়ানুল হক জামি বলেন, গত ছয় মাসে ই-কমার্স দেশের অর্থনীতিতে ১৬ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলেছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে প্রচলিত ব্যবসা-বাণিজ্য যখন স্থবির হয়ে পড়েছিল তখন ই-কমার্সই দেশের ক্ষুদ্র, কুটির ও এসএমই খাতের প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ধরে রেখেছে। দেশে ৭০ লাখ এসএমই ই-কমার্সের মাধ্যমে উপকৃত হয়েছে। তিনি বলেন, ই-কমার্স গত কয়েক বছরে ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ হারে বেড়েছে। গত ছয় মাসে এই প্রবৃদ্ধি ৩০০ থেকে ৪০০ শতাংশ হয়েছে। ই-কমার্সে পেমেন্ট ও পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে যে দুর্বলতা ছিল, সেখানেও উন্নতি হয়েছে। আর ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণেও নীতিমালা হয়েছে। এখন চাইলেই কোনো ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান গ্রাহকের টাকা আটকে রাখতে পারবে না।

ই-ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ আব্দুল ওয়াহেদ তমাল বলেন, ই-কমার্সের সম্ভাবনা সব সময়ই ছিল। করোনার পরিপ্রেক্ষিতে এখন সব পর্যায়ে বিষয়টি উপলব্ধি করছে। ব্যাপক চাহিদা বেড়েছে। এখন সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন দরকার। দরকার ক্রস বর্ডার ব্যবসা বাড়ানোর প্রয়োজনীয় নীতিমালা।

তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে :করোনার সময়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। হোম অফিস ব্যবস্থা চালু হওয়ায় এখন অনেক কাজই হচ্ছে অনলাইনে। আলোচনা সভা, বোর্ড সভার পাশাপাশি ব্যাংক লেনদেন, ডকুমেনটেশন ও বিডিং হচ্ছে অনলাইনে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, করোনার সময়ে এটিএম ও পিওএসের ব্যবহার বেড়েছে। ইন্টারনেট ব্যাংকিংও বেড়েছে। কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন বেড়েছে। অনেক ব্যক্তি এ সময়ে নতুন করে কার্ড ব্যবহার করা শুরু করেছেন। আবার অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পিওএস ব্যবহার শুরু করেছে। মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে লেনদেনও বেড়েছে। এসবের ফলে বাংলাদেশে বেড়েছে ইন্টারনেটের ব্যবহার। স্কুল, কলেজে অনলাইনে লেখাপড়ার আয়োজন করায় মোবাইল, ল্যাপটপের কেনাবেচাও বেড়েছে।

এ কে খান টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম খান বলেন, নিউ নরমালে নিউ বিজনেস আসছে। কারণ, মানুষকে এখন স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হচ্ছে। এর ফলে ই-কমার্স, অনলাইন ট্রেডিং, ব্যাংকিং বাড়ছে। এতে ব্যাংক ও বীমার পরিচালন ব্যয় কমছে। আবার নতুন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান আসছে। ফিন্যান্সিয়াল টেকনোলজির ব্যবহার বাড়ছে। মেডিকেল টেক্সটাইল, ইকুইপমেন্টের চাহিদা বেড়েছে। তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে সরকারের নীতি সহায়তা দরকার।

বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা :এই সময়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে জাপানসহ বিভিন্ন দেশ। ইতোমধ্যে জাপানের যেসব কোম্পানি চীন ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে, তাদের কেউ কেউ বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার কথা জানিয়েছে। চীনের উদ্যোক্তারাও বাংলাদেশে আসতে চাচ্ছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি অনলাইন ব্যবসায় সহায়তাকারী প্রতিষ্ঠান ‘শপআপ’ সিরিজ এ’র ১৯০ কোটি টাকার বিনিয়োগ পেয়েছে। ভারত ও সিঙ্গাপুরভিত্তিক কয়েকটি প্রতিষ্ঠান শপআপে বিনিয়োগ করছে। ইপিজেডগুলোতে বিভিন্ন দেশ থেকে চামড়াজাতশিল্পসহ অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ এসেছে।