‘আকামা ও ভিসার’ মেয়াদ বাড়াল সৌদি সরকার

প্রকাশিত: ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২০

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে দেশে এসে বিমান জটিলতায় আটকে পড়ে সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনিশ্চয়তা কাটছে। সৌদি সরকার আকামার মেয়াদ বাড়িয়েছে। ভিসার মেয়াদও বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি বিমান বাংলাদেশকে নিয়মিত ফ্লাইট পুনরায় চালুর অনুমতি দিয়েছে রিয়াদ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বুধবার রাতে এ তথ্য জানান।

রাত ৯টার দিকে এক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ‘যেসব সৌদি আরব প্রবাসীর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে, সে দেশের সরকার তাদের মেয়াদ বাড়িয়ে দেবে। সৌদি সরকারকে অ্যাপ্রোচ করেছিলাম মেয়াদ বাড়ানোর জন্য। তারা এতে সাড়া দিয়েছে। রোববারে সৌদি মিশন খুলবে। যাদের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তারা বাড়িয়ে নিতে পারবে।’

অন্যদিকে, আরবি সফর মাসে যাদের আকামার মেয়াদ শেষ হবে, তাদের মেয়াদও বৈধ বলে গণ্য হবে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট স্বাভাবিকভাবে চলার অনুমতিও সৌদি সরকার দিয়েছে বলে জানান তিনি। এসব সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন বলেন, ‘আমাদের প্রবাসীরা এখন নিশ্চিন্তে সৌদি আরবে ফিরে যেতে পারবেন।’

এর আগে বাংলাদেশ সরকার জানায়, বাংলাদেশি কর্মীদের আকামার (কাজের অনুমতিপত্র) মেয়াদ ২৪ দিন বাড়িয়েছে সৌদি সরকার। এ ছাড়া ছুটিতে দেশে এসে করোনায় আটকেপড়া বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসার মেয়াদও তিন মাস বাড়ানোর জন্য সৌদি সরকারকে অনুরোধ জানায় বাংলাদেশ সরকার। তাতে সাড়াও দেয় সৌদি সরকার। তবে কতদিনের জন্য ভিসার মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। করোনার ছুটির পর রোববার থেকে খুলবে ঢাকার সৌদি দূতাবাস। তখন ভিসা ইস্যু শুরু হবে। বাড়বে দুই দেশের মধ্যে বিমান চলাচলও।

ভিসা ও আকামার মেয়াদ বৃদ্ধি এবং বিমান চলাচল স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্তেও আটকেপড়া প্রায় ৮০ হাজার কর্মীর জীবিকার অনিশ্চয়তা কেটে যাচ্ছে। রি-এন্ট্রির সময়ের মধ্যে ফিরতে না পারলে চাকরি হারানো এবং কর্মস্থলে ফেরত যাওয়ার সুযোগ হারানোর শঙ্কায় ছিলেন তারা। এ জন্য আগের তিন দিনের মতো গতকাল বুধবারও এসব কর্মী বিমানের টিকিটের দাবিতে পথে নামেন। কারওয়ান বাজারে সৌদি অ্যারাবিয়ান এয়ারলাইন্সের বুকিং কার্যালয়ের সামনে কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ দু’দফা অবরোধ করেন তারা। এতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

সোনারগাঁও হোটেল ভবনে সৌদি এয়ারলাইন্সের বুকিং কার্যালয়ের সামনে টিকিটের জন্য কয়েকশ’ কর্মী টানা চার দিন ধরে অবস্থান করছেন। টোকেন নম্বর পাওয়া এসব কর্মী গতকাল দিনভর টিকিটের আশায় সেখানে ছিলেন। বারবার সময় দিলেও এয়ারলাইন্সটি রাত পর্যন্ত টিকিট দেয়নি। বিকেলে বুকিং কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক জাহিদ হাসান জানান, আরও তিনটি ফ্লাইট বাড়বে।

এর আগে জানা যায়, সপ্তাহে বিমান বাংলাদেশের দুটি ফ্লাইটকে অবতরণের অনুমতি দিয়েছে সৌদি আরব। ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বরের এ দুই ফ্লাইটে গত ১৬ ও ১৭ মার্চের যাত্রীদের নেওয়া হবে। সব মিলিয়ে ৯টি ফ্লাইটে দুই হাজারের কিছু বেশি কর্মী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সৌদি আরব ফিরতে পারবেন। বাকিদের ফেরা ছিল অনিশ্চিত। তারা ফিরতি টিকিট নিয়ে দেশে ফিরলেও এসব যাত্রীর কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা বাড়তি নিচ্ছে সৌদি এয়ারলাইন্স। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ এসেছে, তারা ফিরতি টিকিটের যাত্রীদের বাদ দিয়ে অনলাইন ও ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে নতুন যাত্রীদের কাছে এক থেকে সোয়া লাখ টাকায় ওয়ানওয়ে টিকিট বিক্রি করছে।

প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ইমরান আহমদকে আটকেপড়া কর্মীদের প্রতিনিধি দল এসব অভিযোগ জানায়। এর আগে হাজারখানেক কর্মী অবস্থান নেন ইস্কাটনে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সামনে। তাদের প্রতিনিধিদের কথার পর প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী জানান, ভিসার মেয়াদ বাড়াতে অনুরোধ করা হয়েছে সৌদিকে। সৌদিতে জাতীয় দিবসের ছুটি চলছে। রোববার নাগাদ দেশটির কাছ থেকে ভিসা বৃদ্ধির অনুরোধের জবাব পাওয়ার আশা করছেন মন্ত্রী। তিনি বলেছেন, সৌদি এয়ারলাইন্স যত ফ্লাইট চালাতে চাইবে, কর্মীদের স্বার্থে অনুমতি দেবে বাংলাদেশ। পরে রাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন জানান, ভিসা ও আকামার মেয়াদ বাড়িয়েছে সৌদি আরব। মন্ত্রী বলেন, যেসব বাংলাদেশি তাদের কর্মস্থলে ফিরতে চান, তাদের ভিসা ও আকামার মেয়াদ বাড়াতে সম্মত হয়েছে সৌদি সরকার।

জানা গেছে, চলতি সফর মাসের শেষ দিন পর্যন্ত বিনা খরচে আকামা নবায়ন করতে পারবেন সৌদিতে কর্মরত প্রবাসী কর্মীরা। করোনার কারণে এ সুযোগ পাবেন দেশে ফেরা কর্মীরাও। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, রোববার সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলবেন আব্দুল মোমেন। তাদের বৈঠক থেকে একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে। এর আগে দুপুরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রিফিংয়ে কর্মীদের প্রতি অনুরোধ জানান আন্দোলন না করে ধৈর্য ধারণ করতে।

সৌদিতে কর্মরত বাংলাদেশসহ সব প্রবাসী কর্মীর জন্য তিন দফায় রি-এন্ট্রি মেয়াদ সাত মাস বাড়িয়ে এ মেয়াদ ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হয়েছে। শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ফিলিপাইনসহ অন্যান্য দেশের করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় আগেই সৌদির সঙ্গে তাদের বিমান চলাচল শুরু হয়েছে। ফলে এসব কর্মীর অধিকাংশ কর্মস্থলে ফিরতে পেরেছেন। বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতির খুব বেশি উন্নতি না হওয়ায় অনিশ্চয়তায় পড়েছিলেন এদেশের কর্মীরা।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর রাতের বক্তব্যের আগে জনশক্তি রপ্তানিকারক রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সংগঠন বায়রার সাবেক সভাপতি আবুল বাশার বলেন, আকামার মেয়াদ বৃদ্ধির সঙ্গে এক্সিট রি-এন্ট্রি বা ভিসার মেয়াদের সম্পর্ক নেই। এক্সিট রি-এন্ট্রির মেয়াদ ৩০ সেপ্টেম্বর। এর অর্থ এ সময়ের মধ্যে কর্মস্থলে ফিরতে না পারলে আকামার মেয়াদ থাকলেও লাভ নেই। তবে নিয়োগকারীর (কফিল) মাধ্যমে এক্সিট রি-এন্ট্রির সময়সীমা বাড়ানো যাবে। রি-এন্ট্রির সময়সীমা কফিল ও কর্মীর মধ্যকার বিষয়।

আটকেপড়া কর্মী মো. রিপন জানান, কফিলের মাধ্যমে মেয়াদ বাড়াতে গেলে সাড়ে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত লাগতে পারে। কর্মীরা যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে ছুটিতে, তাই কফিল নিজের টাকায় আকামা নবায়ন করবে না। এ টাকা কর্মীকেই দিতে হবে। ‘মুক্তাম আমেল’ বাবদ ৯ হাজার ৫৫৩ রিয়াল দিতে হবে। শ্রম মন্ত্রণালয়ে ফি দিতে হবে ৬৫০ রিয়াল। সব মিলিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকার ধাক্কা। দেশ থেকে এ টাকা পাঠিয়েও কর্মস্থলে ফেরার অনুমতি মিলবে কিনা, তা নিশ্চিত নয়। অতীতে নজির রয়েছে, কফিল টাকা নিয়েও কাজ করেনি।

বায়রার সভাপতি শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে, যাতে যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক হয় এবং কর্মীরা ফিরে যেতে পারেন। আকামার মেয়াদ বৃদ্ধির ফলে সৌদিতে কর্মরতরা উপকৃত হলেও ভিসার মেয়াদ না বাড়ালে দেশে আটকাপড়াদের খুব একটা লাভ হবে না।

একই কথা বলছেন চাঁদপুরের কচুয়ার মো. হাসান। তিনি সৌদি আরবের মক্কায় এসি মেরামতের দোকান চালান। আগামী ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত তার আকামার মেয়াদ রয়েছে। হাসান গত ২৩ জানুয়ারি তিন মাসের ছুটিতে দেশে ফেরেন। ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত রি-এন্ট্রির মেয়াদ ছিল। তার আগেই ১৯ এপ্রিল তার ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনায় বিমান চলাচল বন্ধ হলে আটকে যান। হাসান সমকালকে বলেন, আকামার মেয়াদ থাকলে কী লাভ! তিনি যদি ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে না ফিরতে পারেন, আকামা কোনো কাজেই আসবে না। তবে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র সমকালকে জানিয়েছে, করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হলে এ বিষয়ে ছাড় পেতে পারে বাংলাদেশ।

বায়রার সাবেক সভাপতি আবুল বাশার বলেছেন, বিমান ও টিকিট সংকটে আটকেপড়া কর্মীদের রক্ষার পথ রি-এন্ট্রি বা ভিসার মেয়াদ বাড়ানো। এর একটিই পথ আছে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা। তারপরও সব কর্মী ফিরতে পারবেন- এ নিশ্চয়তা নেই। একাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক ও সৌদিতে কর্মরত বাংলাদেশিরা সমকালকে জানিয়েছেন, করোনার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের হয়তো আর আগের মতো কর্মীর প্রয়োজন হবে না।